জুমা নামাজ
মহান আল্লাহ্ তায়ালা জুমার দিনকে মুসলমানদের জন্য বরাদ্দ করেছেন। জুমার দিনে যোহরের ওয়াক্তের সময় জুমা নামাজ আদায় করা আল্লাহ্ তায়ালার একটি আদেশ।
আল্লাহ্ তায়ালা,পবিত্র কুরআন মজিদের সূরা জুমার শেষের দিকের আয়াত- ই করিমায় বলেছেন যে, হে ঈমান গ্রহণের কারণে সম্মান অর্জনকারী বান্দা! জুমার দিন,যখন যোহরের আযান দেয়া হয় তখন খুতবা শোনার এবং জুমার নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে গমন কর। ঐ সময়ে বেচাকেনা, ব্যবসা-বানিজ্য ত্যাগ কর। জুমার নামাজ ও খুতবা তোমাদের জন্য অন্যান্য কাজকর্ম থেকে অধিক কল্যাণকর। জুমার নামাজ আদায়ের পরে,মসজিদ থেকে বের হয়ে দুনিয়াবী কাজকর্ম করার জন্য ছড়িয়ে যেতে পার। আল্লাহ্ তায়ালার থেকে রিজিক পাওয়ার আশায় পরিশ্রম কর। আর আল্লাহ্ তায়ালাকে খুব বেশি স্মরণ কর,যাতে করে তোমরা মুক্তি অর্জন করতে পার ।
নামাজ আদায়ের পরে কেউ চাইলে কর্মস্থলে গিয়ে কাজে মনোনিবেশ করতে পারে আবার কেউ চাইলে মসজিদে বসে নফল নামাজ আদায় করতে পারে কুরআন করীম তিলাওয়াত কিংবা দোয়া করতে পারে। জুমার দিনে যোহরের ওয়াক্ত হওয়ার পরে বেচাকেনা করা গুনাহের কাজ।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন হাদিস শরীফের মাধ্যমে জানিয়েছেন যে‘কোন মুসলমান জুমার দিনে গোসল করে জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করলে,তার এক সপ্তাহের গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয় এবং প্রত্যেক কদমের জন্য সওয়াব অর্জন করে’
‘যারা জুমার নামাজ আদায় করে না আল্লাহ্ তায়ালা তাদের ক্বালবসমূহকে মোহর মেরে দেন। তারা গাফিল হয়ে যায় ‘দিবসসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হলো জুমার দিন। জুমার দিন, ঈদের ও আশুরার দিনের থেকেও অধিক মূল্যবান। জুমা মুমিনদের জন্য দুনিয়া ও জান্নাতের ঈদ হিসেবে বিবেচিত
“কোন ব্যক্তি যদি শরয়ী উজর ছাড়া,তিন সপ্তাহ জুমা নামাজ আদায় না করে তাহলে আল্লাহ্ তায়ালা তার ক্বালবে মোহর মেরে দেন’। (অর্থাৎ, পরবর্তীতে সে নেক আমল করতে অপারগ হয়।)
‘জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যখন মুমিন কোন দোয়া করলে তা ফিরিয়ে দেয়া হয় না’'
“জুমার নামাজের পরে সাতবার সূরা ইখলাস ও মুয়াওয়ীযাতাইন {সূরা ফালাক ও সূরা নাস} তিলাওয়াত করলে আল্লাহ্ তায়ালা তাকে এক সপ্তাহের জন্য বালা-মুসীবত,বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন
‘শনিবার যেভাবে ইহুদীদের এবং রবিবার খৃস্টানদের জন্য বিশেষ করা হয়েছে ঠিক তেমনিভাবে জুমার দিনকে মুসলমানদের জন্য বিশেষ করা হয়েছে। এই দিনের মাঝে মুসলমানদের জন্য কল্যাণ ও বরকত নিহিত রয়েছে’'
জুমার দিনে কৃত ইবাদতসমূহের জন্য,অন্যান্য দিনে করা ইবাদতের তুলনায় কমপক্ষে দ্বিগুণ বেশি সওয়াব প্রদান করা হয়। জুমার দিনে করা গুনাহের জন্যও দ্বিগুণ লিখা হয়।
জুমার দিনে রূহসমূহ একত্রিত হয় এবং পরস্পর পরিচিত হয়। কবরসমূহ জিয়ারত করে। এই দিনে কবরের আজাব স্থগিত করা হয়। কোন কোন আলেমের মতে,এরপর আর মুমিন ব্যক্তির আজাব শুরু হয় না। কাফিরের ক্ষেত্রে জুমা ও রমজান মাস ব্যতীত কিয়ামত পর্যন্ত আজাব চলতে থাকে। এই দিনে কিংবা রাতে মৃত্যুবরণকারী মুমিন ব্যক্তি কবর আজাব ভোগ করে না। জাহান্নাম জুমার দিনে তুলনামূলক কম গরম হবে। হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে জুমার দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই জুমার দিনেই জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। জান্নাতবাসীগণ আল্লাহ্ তায়ালাকে জুমার দিনে দেখতে পারবে।
জুমা নামাজের ফরজসমূহ:
জুমার দিনে যোহরের ওয়াক্তে ষোল রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। এর মধ্যে দুই রাকাত ফরজ। জুমার নামাজ যোহরের ফরজ নামাজের চেয়ে অধিক গুরত্বপূর্ণ। জুমার নামাজের ফরজ হওয়ার জন্য দুই ধরণের শর্ত রয়েছে।
১. আদা’ শর্তসমূহ।
২. উজুব শর্তসমূহ।
আদা’ শর্তসমূহ থেকে কোন একটির ঘাটতি থাকলে নামাজ কবুল হয় না। উজুব শর্তসমূহ থেকে কোনটি অপূর্ণ থাকলেও নামাজ কবুল হয়।
আদা” অর্থাৎ জুমার নামাজের সহীহ হওয়ার শর্তসমূহ সাতটি
১. নামাজ আদায়ের স্থান শহর হতে হবে। (এখানে শহর বলতে বুঝানো হয়েছে এমন জনপদ,যে এলাকায় মুসল্লীগণের জন্য ঐ স্থানের সবচেয়ে বড় মসজিদে স্থান সংকুলান হয় না।
২ রাষ্ট্রীয় প্রধান অথবা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে নামাজ আদায় করা। তাদের নিযুক্ত খতীব,নিজের বদলে অন্য কাউকে দ্বায়িত্বভার অর্পন করতে পারে।
৩. যোহরের ওয়াক্তের মধ্যেই জুমা নামাজ আদায় করতে হয়।
৪. খুতবাও যোহরের ওয়াক্তের মধ্যে দিতে হবে। (আলেমগণের মতে, জুমার নামাজের খুতবা বলা · নামাজ শুরুর জন্য যে আল্লাহু আকবর বলা হয় তার অনুরূপ।
অর্থাৎ জুমার দুই খুতবার প্রত্যেকটিই আরবী ভাষায় দেয়া উচিত। খতীব সাহেব নীচু স্বরে ‘আউজু বিল্লাহ' পড়ে উঁচু স্বরে হামদ ও ছানা,কালিমা-ই শাহাদাত, দুরুদ ও সালাম পাঠ করবে। এরপর সওয়াব অর্জনের এবং আজাব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়সমূহ স্মরণ করিয়ে সংশ্লিষ্ট আয়াত ই কারিম তিলাওয়াত করবে। অতঃপর বসবে ও পুনরায় উঠে দাঁড়াবে। খুতবার দ্বিতীয় অংশে ওয়াজের বদলে মুমিনদের জন্য দোয়া করবে। এ সময় চার খলীফার নাম উল্লেখ করা তাদের জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব। খুতবার মধ্যে দুনিয়াবী কথাবার্তার মিশ্রণ করা হারাম। খুতবাকে বক্তৃতা কিংবা কনফারেন্সের মত করে বলা উচিত নয়। খুতবাকে সংক্ষিপ্ত করা সুন্নাত। অতি দীর্ঘ করা মাকরূহ।
৫. নামাজের পূর্বেই খুতবা দিতে হয়।
৬.জুমার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করতে হয়।
৭.যেই মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করা হবে সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার থাকতে হবে।
জুমার নামাজ ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ
১.শহর অথবা গ্রামে অবস্থান করা, মুসাফির ব্যক্তির জন্য জুমা ফরজ নয়।
২. সুস্থ ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হয়। অসুস্থ ব্যক্তি, রোগীর সার্বক্ষণিক পরিচর্যাকারী ও বৃদ্ধদের উপর জুমা ফরজ নয়।
৩. স্বাধীন হওয়া।
৪. পুরুষ হওয়া,নারীর উপর জুমা ফরজ নয়৷
৫. আকেল ও বালেগ হওয়া। অর্থাৎ মুকাল্লিফ হওয়া।
৬. দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন হওয়া। মসজিদে যাওয়ার পথে সাহায্য করার মত কেউ থাকলেও অন্ধ ব্যক্তির উপর জুমা ফরজ নয়।
৭. হাঁটতে সক্ষম হওয়া। কোন গাড়ি বা অন্য কিছুর মাধমে যেতে সক্ষম হলেও পঙ্গু ব্যক্তির জন্য জুমা ফরজ নয়।
৮.বন্দী না হওয়া। জেলে বন্দীর জন্য কিংবা শত্রু সরকার বা জালিমের ভয়ের কারণে মসজিদে যেতে অপারগ হলে তার উপর জুমা ফরজ নয়। ৯.অতিরিক্ত বর্ষণ,তুষারপাত, ঝড়, বন্যা, কাঁদা ও শীত না হওয়া।
জুমার নামাজ আদায়ের পদ্ধতি
জুমার দিনে যোহরের ওয়াক্তে আযান দেয়ার পর, ষোল রাকাত জুমা নামাজ আদায় করা হয়। এগুলো ধারাবাহিকভাবে নিম্নরূপ
১.শুরুতে জুমা নামাজের চার রাকাত ‘কাবলাল জুমা' সুন্নাত আদায় করা হয়। এই সুন্নাত নামাজ যোহরের প্রথম চার রাকাত সুন্নাতের মতই আদায় করা হয়। এই নামাজের জন্য এভাবে নিয়্যাত করা হয়,চার রাকাত কাবলাল জুমা সুন্নাত নামাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কিবলামুখী হয়ে আদায় করার নিয়্যাত করলাম।
২. এরপর মসজিদের মধ্যে জুমার দ্বিতীয় আযান ও খুতবা পাঠ করা হয় ।
৩. খুতবা পেশ করার পর,ইকামত দিয়ে জামাতের সাথে জুমার দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করা হয় ।
৪. জুমার ফরজ নামাজ আদায়ের পরে চার রাকাত ‘বা’দাল জুমা' নামক সুন্নাত নামাজ আদায় করা হয়। এই নামাজ যোহরের প্রথম চার রাকাত সুন্নাতের নিয়মেই আদায় করা হয়।
৫.এরপরে“শেষ যোহরের চার রাকাত নামাজ যা আমার উপর ফরজ হয়েছে কিন্তু আদায় করা হয় নি তা আদায়ের জন্য” বলে নিয়্যাত করে ‘যোহর উ আখের নামাজ আদায় করা হয়। চার রাকাত বিশিষ্ট এই নামাজ,যোহরের ফরজ নামাজের নিয়মে আদায় করতে হয়।
৬. এরপরে দুই রাকাত ‘ওয়াক্তের সুন্নাত' নামাজ আদায় করা হয়। এই নামাজ আদায়ের পদ্ধতি ফজরের সুন্নাতের অনুরূপ।
৭.তারপর‘আয়াতুল কুরসী' ও তাসবীহসমূহ পড়ে দোয়া করা হয়।
জুমার দিনের সুন্নাত ও মুস্তাহাবসমূহ
১. জুমাকে বৃহস্পতিবার থেকেই স্বাগত জানানো ও এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
২. জুমার দিনে গোসল করা।
৩.চুল কাটা, এক মুষ্ঠির চেয়ে অতিরিক্ত দাঁড়ি ছাঁটা, নখ কাটা ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা।
৪.জুমার নামাজে যথাসম্ভব আগে উপস্থিত হওয়া।
৫. সামনের কাতারে যাওয়ার জন্য জামাতে উপস্থিত মুসল্লীদের কাঁধ না ডিঙ্গানো।
৬.মসজিদে নামাজরত কারো সামনে দিয়ে অতিক্রম না করা ।
৭. খতীব সাহেব মিম্বারে উঠার পর কোন ধরণের কথাবার্তা না বলা। এমনকি কেউ কথা বললে তাকে চুপ করানোর জন্য কিংবা জবাব দেয়ার জন্য ইশারা পর্যন্ত না করা। এসময় আযানের পুনরাবৃতি করাও উচিত নয়।
৮.জুমা নামাজ আদায়ের পরে সূরা ফাতিহা কাফিরুন, ইখলাস,ফালাক ও নাস্ সাতবার করে পাঠ করা।
৯.সম্ভব হলে আছরের ওয়াক্ত পর্যন্ত মসজিদে থেকে ইবাদত করা।
১০. আহলে সুন্নাহআলেমগণের রচিত কিতাবসমূহ থেকে আলোচনা করা হয় এমন আলেমের দারসে বা ওয়াজে অংশগ্রহণ করা।
১১.জুমার দিন,যথাসম্ভব ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা।
১২. জুমার দিন রাসূলের প্রতি বেশি বেশি দুরুদ ও সালাম পেশ করা।
১৩. পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা। বিশেষ করে ‘সূরা কাহফ” তিলাওয়াত করা।
১৪. দান-সদকা করা।
১৫.মা বাবা এবং কবর জিয়ারত করা।
১৬ ঘরে বেশি খাবারের ব্যবস্থা করা,মিষ্টান্ন প্রস্তুত করা।
১৭. বেশি বেশি নামাজ আদায় করা। যাদের ক্বাজা নামাজ রয়েছে তারা ঐ ক্বাজা নামাজ আদায় করবে।
